স্টাফ রিপোর্টার: হাসমত
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক সদরচালা এলাকায় স্থানীয় ‘ভয়েস ক্লাব’-এর উদ্যোগে গত কয়েকদিন ধরে জমজমাটভাবে চলছে একটি মেলা। মেলায় নৌকা, চরকা, বক্সারসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক রাইড বসানো হয়েছে। পাশাপাশি নাচ-গানের আয়োজনের জন্য তৈরি করা হয়েছে আলাদা স্টেজ।
তবে মেলা আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে উচ্চ শব্দে মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিরক্তি ও ক্ষোভের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মেলা ঘিরে ভিড়
সরেজমিনে দেখা যায়, মৌচাক সদরচালা এলাকায় মেলাকে ঘিরে বেশ ভিড় জমেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মেলায় আসছেন। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের রাইড বসানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাচ-গানের আয়োজন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫-৬ দিন ধরে মেলা প্রাঙ্গণে নাচ-গানের অনুষ্ঠান চলছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর উচ্চ শব্দে গান বাজানোর কারণে আশপাশের বাসাবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে থাকা মানুষ সমস্যায় পড়ছেন।
পুলিশের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের দাবি
মেলা পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শাহীন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, কালিয়াকৈর থানা ও মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশের সঙ্গে কথা বলেই মেলা বসানো হয়েছে।
শাহীন আরও দাবি করেন, মেলা বসানোর জন্য পুলিশকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো টাকা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে আয়োজকের এই দাবির সত্যতা যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর শামীম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মেলা বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
তিনি জানান, ইউএনও তাকে এ বিষয়ে জানালে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজের দায়িত্বাধীন এলাকায় মেলা বসার বিষয়টি জানার পরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে ইন্সপেক্টর শামীম হোসেন বলেন, মেলার বিষয়ে তার করার কিছু নেই।
পুলিশ কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রয়োজন থাকে, তাহলে শুধু মৌখিকভাবে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেই এমন আয়োজন পরিচালনা করা যায় কি না।
অনুমতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, কোনো বিনোদনমূলক মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমোদন, জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ, জনসাধারণের চলাচল এবং স্থানীয় পরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে মেলায় স্থাপন করা বিভিন্ন রাইডের নিরাপত্তা ও বৈধতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
তাদের প্রশ্ন, মেলাটি যদি বৈধ অনুমোদন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনের কাগজপত্র কী এবং কী শর্তে মেলা পরিচালিত হচ্ছে—তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আর অনুমোদন না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এখনো ব্যবস্থা নেয়নি, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
নাচ-গানের আয়োজন নিয়ে অভিযোগ
মেলায় রাইড ও দোকানপাটের পাশাপাশি নাচ-গানের জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি স্টেজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫-৬ দিন ধরে সন্ধ্যার পর সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে।
মসজিদ, বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার কাছাকাছি এ ধরনের উচ্চ শব্দের আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নামাজের সময় এবং রাতের দিকে মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের কারণে স্বাভাবিক ও ধর্মীয় পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
মেলা বন্ধের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, তাদের আপত্তি বিনোদনমূলক মেলার বিরুদ্ধে নয়। তবে অনুমোদন ছাড়া অথবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে মেলা পরিচালনা করা হলে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, মেলার কারণে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক চলাচল, ধর্মীয় পরিবেশ কিংবা জনজীবন ব্যাহত হলে প্রশাসনের উচিত বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, একটি মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমোদনের পাশাপাশি জননিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, রাইডগুলোর কারিগরি নিরাপত্তা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, কোনো আয়োজক যদি দাবি করেন যে পুলিশের অনুমতি বা সহযোগিতা নিয়ে মেলা বসানো হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অনুমতি বা সহযোগিতা দেওয়া হয়ে থাকলে তার ভিত্তি ও শর্ত কী ছিল, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের যে দাবি আয়োজক করেছেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
প্রশাসনের নজরদারি চান এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেলার অনুমোদন, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং উচ্চ শব্দে গান-বাজনার বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা কালিয়াকৈর উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে মেলার বৈধতা যাচাই, অনুমোদনের কাগজপত্র পরীক্ষা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করে মেলাটি বৈধ অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়ম বা অনুমোদনহীন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আয়োজক শাহীন পুলিশের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের যে দাবি করেছেন, তার সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশাসন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। তদন্তের পরই এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য স্পষ্ট হবে।