দুর্নীতি করলেও সাংবাদিকের কী!’ ৩০ শতাংশ কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে বেপরোয়া প্রকৌশলী রাজীব!

Spread the love

ঘুষ, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও ২১ লাখ টাকার অডিট আপত্তি; বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশও উপেক্ষিত, সাংবাদিককে কটাক্ষ—‘এটা দেখার দায়িত্ব দুদকের’; উল্টো প্রশ্ন, ‘টাকার জন্য ফোন দিয়েছেন?’

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক।

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভায় উন্নয়নকাজে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্য, ঘুষ আদায়, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও সরকারি অর্থের অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারদের বিল ছাড়, সাইট পরিদর্শন, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, পানি সরবরাহ ও ল্যাট্রিন প্রকল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

অডিটে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকার আর্থিক ক্ষতির বিষয়ও উঠে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রকল্পের নথিপত্র তলব ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকলেও এখানে সাংবাদিকের কী কাজ? এটা দেখার দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের।’ সাংবাদিককে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা তো টাকার জন্য ফোন দিয়েছেন?’

৩০ শতাংশ কমিশন, সাইট পরিদর্শনে ৪ হাজার টাকা!
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সাব-ঠিকাদারদের অভিযোগ, পৌরসভার উন্নয়নকাজের বিল ছাড় ও সাইট পরিদর্শনে রাজীব মজুমদারের নির্দিষ্ট কমিশন রয়েছে। ঠিকাদার মো. তসলিম উদ্দীনের অভিযোগ, প্রতিটি কাজের বিপরীতে তিনি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেন। চন্দনাইশ হাসপাতালের গেট নির্মাণকাজ থেকে ৯০ হাজার টাকা আদায় করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিবার সাইট পরিদর্শনে ৪ হাজার টাকা এবং সব দাবি পূরণের পরও চূড়ান্ত বিলের বিপরীতে অতিরিক্ত ৬ শতাংশ কমিশন চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে বিল ও নথিপত্র আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন ঠিকাদাররা।

ভবন অনুমোদনের নামে অর্থ আদায়ঃ
স্থানীয় বাসিন্দা ও এলডিপি চন্দনাইশ পৌরসভা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতার উদ্দীনের অভিযোগে বলা হয়েছে, ইমারত নির্মাণ অনুমোদন কমিটির নিয়মিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সরাসরি ফাইল অনুমোদনের আশ্বাসে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল শুক্কুরের কাছ থেকে ৩৮ হাজার, হামিদুল্লাহ সিকদারের কাছ থেকে ৪৫ হাজার এবং শাহা আলমের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাঁদের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আরও অনেকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

পানি ও ল্যাট্রিন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগঃ
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহ প্রকল্পে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, নকশার নির্ধারিত গভীরতার অর্ধেক গভীরে পাইপ স্থাপন এবং কোথাও পাইপ না বসিয়েই সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীনভাবে প্রায় ৮০০টি পিট ল্যাট্রিনের তালিকা তৈরি করে বাস্তবে টয়লেট নির্মাণ ছাড়াই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অডিটে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকার ক্ষতিঃ
২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) অডিটে বিসি রাস্তার ব্রিক ওয়ালে অতিরিক্ত বিল প্রদান এবং আর্থ ফিলিংয়ে বক্স কাটিংয়ের মাটি কর্তন না দেখিয়ে সরকারের ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকা আর্থিক ক্ষতির বিষয় উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১০ কোটি টাকার কাজ বণ্টন ও জনদুর্ভোগঃ
পৌরসভার সচিবের শূন্যপদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে রাজীবের বিরুদ্ধে। পর্যাপ্ত পুঁজি ও তদারকির অভাবে দুলারপাড়া-দুর্লভপাড়া এলাকার কাজগুলো ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে গাছবাড়ীয়া খাঁনহাট থেকে আব্দুল বারী হাট পর্যন্ত সড়কের দুর্লভপাড়া বটতল এলাকার পুকুরপাড়ের কাজ ‘নিপা এন্টারপ্রাইজ’ ফেলে রাখায় ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। অন্যদিকে প্রায় ১২০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও পৌরবাসী নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তের নির্দেশ, তবু ব্যবস্থা নেইঃ
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তারের স্বাক্ষরিত স্মারকে রাজীব মজুমদারের দায়িত্ব পালনকালীন প্রকল্পের ফাইল তলব ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। দুদক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

সাংবাদিককে কটাক্ষ—‘টাকার জন্য ফোন দিয়েছেন?’ অভিযোগের বিষয়ে রাজীব মজুমদারের বক্তব্য জানতে মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সাড়া দেননি। পরে কথা হলে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকলেও এখানে সাংবাদিকের কী কাজ? এটা দেখার দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। এটা সাংবাদিকের কাজ না। আপনি এটা নিয়ে আমাকে ফোন দেবেন কেন?’
একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা তো টাকার জন্য ফোন দিয়েছেন?’

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্ন করা পেশাগত দায়িত্ব। অথচ অভিযোগের জবাব না দিয়ে সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং অর্থের বিনিময়ে ফোন করার ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য তাঁর আচরণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিঃ
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকল্পের নথিপত্র, বিল-ভাউচার, অডিট আপত্তি ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পৌরসভার উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যসহ সব পক্ষের তথ্য ও নথি যাচাই করা জরুরি।