গাইবান্ধার মফস্বল সংবাদদাতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক সংগঠক: এম এ মমিন আনসারীর দীর্ঘ পথচলা

Spread the love

১৯৯৭ সালে দৈনিক ঘাঘটে স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। প্রায় তিন দশকের পথচলায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রতিনিধি, নির্বাহী সম্পাদক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, একাধিক জাতীয় সাংবাদিক সংগঠনে নেতৃত্ব এবং সামাজিক ব্যবসার উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন বহুমাত্রিক পেশাগত পরিচয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক।

সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি দায়িত্ব, সাহস, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই বিশ্বাসকে ধারণ করে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পথচলা শুরু করেন এম এ মমিন আনসারী। গাইবান্ধার মফস্বল শহর থেকে স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে শুরু হওয়া সেই পথচলা সময়ের পরিক্রমায় তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্র সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠক ও সামাজিক উদ্যোক্তার পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি গাইবান্ধা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এম এ মমিন আনসারী। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসএস। ছোটবেলা থেকেই সংবাদমাধ্যম ও সমাজের নানা অসংগতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল তাঁর। সেই আগ্রহ থেকেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৯৭ সালে গাইবান্ধার দৈনিক ঘাঘট পত্রিকায় স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর পেশাগত জীবনের দীর্ঘ অধ্যায়।

মফস্বল সাংবাদিকতা থেকে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে

দৈনিক ঘাঘটে সাংবাদিকতা শুরুর পর একে একে বিভিন্ন সংবাদপত্রে যুক্ত হন তিনি। মুক্ত সকাল, সাপ্তাহিক আলো, ইত্তেহাদ ও দৈনিক জনতা পত্রিকায় পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ, সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধ, অনিয়ম ও জনদুর্ভোগের খবর প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্র সম্পাদনার দায়িত্বেও যুক্ত হন। সাপ্তাহিক দেশের ডাক, দৈনিক অন্য দিগন্ত এবং দৈনিক সবুজ বাংলাদেশে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সাপ্তাহিক মুক্ত বাংলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্টের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘ এই পথচলায় সংবাদ সংগ্রহ থেকে সংবাদ সম্পাদনা এবং সংবাদপত্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। বিশেষ করে অপরাধ, দুর্নীতি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা

এম এ মমিন আনসারীর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম। ২০০৭ সাল থেকে তিনি সাংবাদিকদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বেও সম্পৃক্ত হন।

সাংবাদিকদের ন্যায্য দাবি আদায়, পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ এবং সাংবাদিক সমাজের ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন।

২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশ অনলাইন সাংবাদিক পরিষদ (বিওএসপি)-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংবাদিক সোসাইটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে সাংবাদিক সংগঠনসমূহের জাতীয় জোট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এ্যাজবা)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ দায়িত্বে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়, ঐক্য ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করেন।

গাজীপুর জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি প্রতিষ্ঠা

সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালে তিনি গাজীপুরে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য গাজীপুর জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি (জিডিআরইউ) প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গাজীপুরে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য, পেশাগত সহযোগিতা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি।

বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদের নেতৃত্ব

বর্তমানে এম এ মমিন আনসারী বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ (বিএসকেপি)-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, হুমকি ও হয়রানির ঘটনায় প্রতিবাদ, বিবৃতি প্রদান এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানোর মতো কর্মকাণ্ডে সংগঠনের পক্ষ থেকে ভূমিকা পালন করছেন।

সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও তিনি জোর দিয়ে থাকেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোক্তা

পেশাগত সাংবাদিকতার বাইরে সামাজিক ব্যবসার ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছেন এম এ মমিন আনসারী। তিনি পেনশন বাজার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির মূল ধারণা হলো দৈনন্দিন বাজার খরচের মধ্য থেকে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা ও পেনশন সুবিধার উদ্যোগ নেওয়া। এর মূল স্লোগান—“বাজার খরচ থেকেই হবে সঞ্চয়, আর সঞ্চয় থেকে হবে পেনশন।”

সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সীমিত আয়ের পরিবারকে সঞ্চয়ের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার ধারণা ছড়িয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র সম্পাদনা, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব স্বীকৃতি ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক সমাজের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা।

বহুমাত্রিক কর্মজীবনের এক পরিচয়

১৯৯৭ সালে একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের সংবাদদাতা হিসেবে শুরু হওয়া সাংবাদিকতা জীবনে এম এ মমিন আনসারী বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রতিনিধি, নির্বাহী সম্পাদক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে জাতীয় পর্যায়ের সংগঠনে নেতৃত্ব এবং জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

একদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র সম্পাদনা, অন্যদিকে সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার উদ্যোগ—এই তিনটি ধারায় তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত।

গাইবান্ধার মফস্বল সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্র সম্পাদনা ও সাংবাদিক সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার দীর্ঘ পথচলা তাঁর পেশাগত জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর এই পথচলার মূল পরিচয় সাংবাদিকতা, সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বহুমাত্রিক কর্মজীবন।

এম এ মমিন আনসারী
সম্পাদক, জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট
মহাসচিব, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ (বিএসকেপি)
চেয়ারম্যান ও সিইও, পেনশন বাজার লিমিটেড