আব্দুর রশিদ তারেক, নওগাঁঃ
নওগাঁয় এক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খাজনা-খারিজসহ ভূমি-সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানে পকেট কাটা হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের। আবার চাহিদা মত ঘুষ না দিলে মিলছেনা কাঙ্খিত সেবা। এছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজ দিয়েও খারিজ করে দেওয়ার তথ্য এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। ওই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তার নাম হাবিবুজ্জামান জিয়া। তিনি নওগাঁ পৌরসভা-চন্ডিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন। জনশ্রুতি আছে সবচেয়ে লোভনীয় কর্মক্ষেত্র শহরের এই ইউনিয়ন ভূমি অফিস।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হাবিবুজ্জামান জিয়া ২০২৪ সালের ২০ আগষ্ট নওগাঁ পৌরসভা-চন্ডিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগদান করেন। এরপর তার পছন্দ মতো ব্যক্তিকে নিয়ে একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন তিনি। ফলে জমি-জমা সংক্রান্ত কোনো সেবা পেতে গ্রাহকদের দিতে হয় ঘুষ। কেউ টাকা দিতে না চাইলে দিনের পর দিন করা হয় হয়রানি। ঘুষ না দিলে পড়ে থাকে ফাইল।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, এই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রকাশ্যই চলে ঘুষ বাণিজ্য। এমনই দৃশ্য ধরা পড়ে এই প্রতিবেদকের ক্যামেরায়। অফিসের এক কোণে সেবাগ্রহীতা এক নারী কর্মরত অফিস স্টাফকে টাকা বের করে দেন। সে সময় ওই কর্মচারীকে বলতে শুনা যায় ‘বসকে দেন, আমাকে না’। হাতে টাকা নেওয়ার পরও ফেরত দিয়ে বসকে দিতে বলেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার কেনা দুই কাঠা জমি একজনের মাধ্যমে খারিজ করতে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে আমি নিজে গিয়ে টিডিআর জিয়ার সঙ্গে দেখা করি। এবং একটি ভুল ধরে টাকা দাবি করে জিয়া। আমি প্রথমে তিন হাজার টাকা এবং কিছুদিন পর আরও তিন হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু তারপরও আমার জমির খারিজ আবেদন বাতিল করা হয়েছে। শুধুমাত্র জিয়ার প্রথম আবেদন বাতিল করার কারণে ২য় দফায় করা আবেদন তৎকালীন এসিল্যান্ড বাতিল করে দেন। এরপর আমার দেওয়া ৬ হাজার টাকা ফেরত চাইলে তিনি তালবাহানা করেন।
আরেক ভুক্তভোগী খাদেমুল ইসলাম বলেন, আমার ৭০শতক এবং একটি মাদরাসার ৯০শতক জমি আছে। আমরা প্রথমে ভূমি অফিসে গেলে খাজনা-খারিজ হবেনা বলে জানিয়ে দেয় জিয়া। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে গেলে আমাদের কাছে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। তবে আমরা এক লাখ টাকা দিয়ে আসি জিয়াকে। পরবর্তীতে এক মধ্যস্থকারী জিয়াকে তিন লাখ টাকা দিতে চায়, তাতেও সে রাজি হয়না। এরপর পিছিয়ে যায় মাদারাসা জমির খারিজ করা থেকে। তবে আমার জমির খারিজের জন্য জিয়ার প্ররাচনায় তৎকালীন এক কর্মকর্তা ৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। আমি সেই কর্মকর্তাকে দেড় লাখ দিলেও খারিজটি বাতিল করে দেওয়া হয় শুধুমাত্র টিডিআর জিয়ার স্বার্থের জন্য।
তিনি আরও বলেন, আমার জমি খারিজ হয়ে গেলে মাদরাসার ওই জমির খারিজের সময় ঘুষ থেকে বঞ্চিত হবে জিয়া। তাই আমার খারিজ পাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তিনি। বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করলে আমাদের পূর্বে দেওয়া এক লাখ টাকা ফেরত দেয় জিয়া।
এদিকে তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সদর উপজেলার হাপানিয়া-বক্তারপুর ইউনিয়ন ভ’মি অফিসে উপ-সহাকারী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় অফিস প্রধানের স্বাক্ষর ছাড়াই হাবিবুজ্জামান জিয়া ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে একটি জাল খতিয়ান তৈরি করে জমি খারিজের অনুমোদন করে দেন। পরে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথের প্রতিবেদনে উঠে আসে হাবিবুজ্জামানের জালিয়াতির তথ্য। তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন ৮৮২৯/৯৫ প্রেরিত দলিলে ৩০৯/৭৫-৭৬ খারিজ কেসের প্রস্তাবিত ২৮/১ খতিয়ানটি কোন হোল্ডিং থেকে তিনি করেছেন তা দেখাতে পারেননি উপ-সহকারী কর্মকর্তা হাবিবুজ্জামান জিয়া এবং স্পষ্ট করে কোন জবাব দেয়নি তিনি। তার প্রস্তাবিত ২৮/১ নং খারিজী খতিয়ানটি বানোয়াট ও যোগসাজসে প্রতীয়মান হয়। এছাড়া ৮৮২৯ নং দলিল দাতার নামের সাথে এস.এ এবং আর.এস রেকর্ডীয় মালিকের নামেরও মিল নাই।
একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে স্বাক্ষর ও সীল সম্বলিত হাবিবুজ্জামান জিয়ার প্রস্তাবিত খতিয়ানটি জাল। আবার উল্লেখিত ৩৭৫১/১৮-১৯ নং খারিজ কেসটিতে ওই সময় অফিস প্রধানের স্বাক্ষর ছাড়াই হাবিবুজ্জামান জিয়া উপ-সহকারী কর্মকর্তা হয়েও নিজেই অনুমোদনের প্রস্তাব দেন-যা সম্পূর্ন নিয়মবহির্ভূত ও জালিয়াতি। এছাড়া নামজারিতে উল্লেখিত ১৯৬৮সালের দলিল নওগাঁয় কোনো ভলিউমে নেই।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা হাবিবুজ্জামান জিয়া সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে জাল খতিয়ানের বিষয়ে তিনি বলেন, ওটা মিমাংসিত একটা বিষয়। এবিষয়ে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাই বাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।